শিশুদের হাইড্রোকেফালাস হওয়ার কারণ: অভিভাবকদের যা জানা জরুরি

শিশুদের হাইড্রোকেফালাস হওয়ার কারণ: অভিভাবকদের যা জানা জরুরি

শিশুর মাথা বয়সের তুলনায় দ্রুত বড় হয়ে যাওয়া, মাথার সামনের নরম অংশ ফুলে ওঠা, চোখ নিচের দিকে নেমে থাকা, বারবার বমি, খিঁচুনি, অতিরিক্ত ঘুম অথবা শিশুর স্বাভাবিক বিকাশে বিলম্ব—এসব লক্ষণ হাইড্রোকেফালাস নামের একটি গুরুত্বপূর্ণ স্নায়বিক রোগের ইঙ্গিত হতে পারে।

বাংলাদেশে অনেক অভিভাবক হাইড্রোকেফালাসকে সাধারণভাবে “শিশুর মাথায় পানি জমা” বলে থাকেন। তবে এটি শুধু মাথায় পানি জমার সমস্যা নয়। মূলত মস্তিষ্কের ভেতরে সেরিব্রোস্পাইনাল ফ্লুইড বা CSF নামের বিশেষ তরল স্বাভাবিকভাবে চলাচল বা শোষিত হতে না পারলে মস্তিষ্কের ভেন্ট্রিকলে অতিরিক্ত তরল জমে যায়। এর ফলে মস্তিষ্কের ওপর চাপ সৃষ্টি হতে পারে।

শিশুদের হাইড্রোকেফালাস জন্মগত কারণেও হতে পারে, আবার জন্মের পর সংক্রমণ, রক্তক্ষরণ, ব্রেইন টিউমার, মাথায় আঘাত অথবা অন্য কোনো রোগের কারণেও হতে পারে। হাইড্রোকেফালাসের কারণ দ্রুত শনাক্ত করা গেলে শিশুর জন্য উপযুক্ত চিকিৎসা পরিকল্পনা করা সহজ হয়।

নেফাউর’স নিউরোকেয়ারে জন্ম থেকে ১৮ বছর বয়সী শিশু-কিশোরদের ব্রেইন, নার্ভ, স্পাইন, স্ট্রোক এবং সংশ্লিষ্ট নিউরোলজিক্যাল ও নিউরোসার্জিক্যাল সমস্যার মূল্যায়ন ও চিকিৎসাসেবা প্রদান করা হয়।

হাইড্রোকেফালাস কী?

মস্তিষ্ক ও স্পাইনাল কর্ডের চারপাশে সেরিব্রোস্পাইনাল ফ্লুইড বা CSF নামের একটি স্বচ্ছ তরল থাকে। এই তরল মস্তিষ্ককে আঘাত থেকে সুরক্ষা দেয়, প্রয়োজনীয় পুষ্টি পরিবহনে সাহায্য করে এবং মস্তিষ্কের স্বাভাবিক পরিবেশ বজায় রাখে।

CSF সাধারণত মস্তিষ্কের ভেন্ট্রিকলে তৈরি হয়, নির্দিষ্ট পথ দিয়ে প্রবাহিত হয় এবং পরে রক্তে শোষিত হয়ে যায়। কিন্তু CSF চলাচলের পথে বাধা সৃষ্টি হলে, অতিরিক্ত তরল তৈরি হলে অথবা তরল সঠিকভাবে শোষিত না হলে ভেন্ট্রিকলে তরল জমতে থাকে। এই অবস্থাই হাইড্রোকেফালাস।

শিশুর বয়স, হাইড্রোকেফালাসের কারণ এবং মস্তিষ্কের ওপর চাপের মাত্রার ওপর রোগের লক্ষণ ও জটিলতা নির্ভর করে।

শিশুদের হাইড্রোকেফালাস হওয়ার প্রধান কারণ

শিশুদের হাইড্রোকেফালাসের কারণকে সাধারণভাবে দুই ভাগে ভাগ করা যায়—

  1. জন্মগত হাইড্রোকেফালাস
  2. জন্মের পর অর্জিত বা অ্যাকোয়ার্ড হাইড্রোকেফালাস

১. জন্মগত হাইড্রোকেফালাস

শিশুর মস্তিষ্কে গর্ভাবস্থাতেই CSF চলাচলের সমস্যা তৈরি হলে বা জন্মের সময় হাইড্রোকেফালাস উপস্থিত থাকলে তাকে জন্মগত হাইড্রোকেফালাস বলা হয়।

অ্যাকুইডাক্টাল স্টেনোসিস

মস্তিষ্কের তৃতীয় ও চতুর্থ ভেন্ট্রিকলের মধ্যে CSF চলাচলের একটি সরু পথ রয়েছে, যাকে সেরিব্রাল অ্যাকুইডাক্ট বলা হয়। এই পথ জন্মগতভাবে সরু বা বন্ধ থাকলে CSF স্বাভাবিকভাবে চলতে পারে না।

অ্যাকুইডাক্টাল স্টেনোসিস শিশুদের অবস্ট্রাকটিভ হাইড্রোকেফালাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ।

স্পাইনা বিফিডা ও মাইলোমেনিনগোসিল

স্পাইনা বিফিডা একটি জন্মগত নিউরাল টিউব ডিফেক্ট। এর গুরুতর ধরন মাইলোমেনিনগোসিলে শিশুর স্পাইন ও স্পাইনাল কর্ডের একটি অংশ সঠিকভাবে গঠিত হয় না।

মাইলোমেনিনগোসিল আক্রান্ত অনেক শিশুর সঙ্গে কিয়ারি ম্যালফরমেশন ও হাইড্রোকেফালাস থাকতে পারে। তাই জন্মের পর এসব শিশুর মাথার পরিধি, ফন্টানেল, চোখের অবস্থা এবং মস্তিষ্কের ভেন্ট্রিকল নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করা প্রয়োজন।

কিয়ারি ম্যালফরমেশন

কিয়ারি ম্যালফরমেশনে মস্তিষ্কের নিচের অংশ স্বাভাবিক অবস্থান থেকে নিচের দিকে নেমে যেতে পারে। এর ফলে CSF চলাচলের পথে বাধা সৃষ্টি হয়ে হাইড্রোকেফালাস হতে পারে।

ড্যান্ডি–ওয়াকার ম্যালফরমেশন

ড্যান্ডি–ওয়াকার ম্যালফরমেশন মস্তিষ্কের পেছনের অংশ, বিশেষ করে সেরিবেলাম ও চতুর্থ ভেন্ট্রিকলের জন্মগত অস্বাভাবিকতা। এর কারণে CSF চলাচলে বাধা সৃষ্টি হতে পারে এবং শিশুর হাইড্রোকেফালাস হতে পারে।

মস্তিষ্কের অন্যান্য জন্মগত গঠনগত ত্রুটি

মস্তিষ্কের ভেন্ট্রিকল, CSF চলাচলের পথ, মস্তিষ্কের আবরণ বা পেছনের অংশের গঠনগত ত্রুটির কারণেও জন্মগত হাইড্রোকেফালাস হতে পারে।

কিছু ক্ষেত্রে হাইড্রোকেফালাসের সঙ্গে নিচের সমস্যাগুলো থাকতে পারে—

  • এনসেফালোসিল
  • অ্যারাকনয়েড সিস্ট
  • ব্রেইন সিস্ট
  • মস্তিষ্কের মধ্যরেখার গঠনগত অস্বাভাবিকতা
  • জন্মগত ব্রেইন টিউমার
  • নিউরাল টিউব ডিফেক্ট

গর্ভাবস্থায় সংক্রমণ

গর্ভাবস্থায় মায়ের কিছু সংক্রমণ ভ্রূণের মস্তিষ্কের বিকাশকে প্রভাবিত করতে পারে। এর ফলে মস্তিষ্কে প্রদাহ, ক্যালসিফিকেশন, CSF চলাচলের প্রতিবন্ধকতা অথবা জন্মগত হাইড্রোকেফালাস তৈরি হতে পারে।

তবে গর্ভাবস্থায় কোনো সংক্রমণ হলেই শিশুর হাইড্রোকেফালাস হবে—এমন নয়। ঝুঁকি নির্ভর করে সংক্রমণের ধরন, সময়কাল এবং ভ্রূণের ওপর প্রভাবের মাত্রার ওপর।

জেনেটিক বা বংশগত কারণ

কিছু বিরল ক্ষেত্রে জেনেটিক পরিবর্তন বা বংশগত সমস্যার কারণে শিশুর অ্যাকুইডাক্টাল স্টেনোসিস বা অন্যান্য ধরনের জন্মগত হাইড্রোকেফালাস হতে পারে।

একই পরিবারে একাধিক শিশুর অনুরূপ সমস্যা থাকলে অথবা হাইড্রোকেফালাসের সঙ্গে অন্য জন্মগত ত্রুটি থাকলে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক প্রয়োজন অনুযায়ী জেনেটিক কাউন্সেলিংয়ের পরামর্শ দিতে পারেন।

২. জন্মের পর অর্জিত হাইড্রোকেফালাস

শিশু জন্মের সময় স্বাভাবিক থাকলেও পরবর্তীতে বিভিন্ন রোগ, সংক্রমণ, রক্তক্ষরণ, টিউমার বা আঘাতের কারণে হাইড্রোকেফালাস হতে পারে। একে অ্যাকোয়ার্ড হাইড্রোকেফালাস বলা হয়।

মেনিনজাইটিস ও মস্তিষ্কের সংক্রমণ

মেনিনজাইটিসে মস্তিষ্ক ও স্পাইনাল কর্ডের আবরণে প্রদাহ হয়। সংক্রমণের পর মস্তিষ্কের আবরণে দাগ বা আঠালো পরিবর্তন তৈরি হলে CSF সঠিকভাবে শোষিত হতে পারে না।

এর ফলে কমিউনিকেটিং হাইড্রোকেফালাস হতে পারে।

বাংলাদেশে শিশুদের জ্বর, খিঁচুনি, ঘাড় শক্ত হওয়া, অচেতনতা বা মেনিনজাইটিসের লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত হাসপাতালে নেওয়া অত্যন্ত জরুরি। সংক্রমণের চিকিৎসায় দেরি হলে হাইড্রোকেফালাসসহ অন্যান্য স্নায়বিক জটিলতা তৈরি হতে পারে।

নবজাতকের মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণ

অপরিণত বা প্রিম্যাচিউর শিশুদের মস্তিষ্কের ভেন্ট্রিকলের ভেতরে রক্তক্ষরণ হতে পারে, যাকে ইন্ট্রাভেন্ট্রিকুলার হেমোরেজ বলা হয়।

রক্ত জমাট বেঁধে CSF চলাচলের পথ বন্ধ করতে পারে অথবা CSF শোষণের স্বাভাবিক প্রক্রিয়া ব্যাহত করতে পারে। এর ফলে পোস্ট-হেমোরেজিক হাইড্রোকেফালাস তৈরি হতে পারে।

ব্রেইন টিউমার

শিশুর মস্তিষ্কে টিউমার হলে সেটি CSF চলাচলের পথ চাপ দিয়ে বন্ধ করতে পারে। বিশেষ করে মস্তিষ্কের পেছনের অংশ, চতুর্থ ভেন্ট্রিকল, ব্রেইনস্টেম, পাইনিয়াল অঞ্চল বা তৃতীয় ভেন্ট্রিকলের আশেপাশে টিউমার হলে অবস্ট্রাকটিভ হাইড্রোকেফালাস হতে পারে।

ব্রেইন টিউমারের সঙ্গে শিশুর মধ্যে দেখা দিতে পারে—

  • সকালে বেশি মাথাব্যথা
  • বারবার বমি
  • হাঁটাচলায় ভারসাম্যহীনতা
  • চোখে ঝাপসা দেখা
  • আচরণে পরিবর্তন
  • খিঁচুনি
  • অতিরিক্ত ঘুম
  • স্কুলের পারফরম্যান্স কমে যাওয়া

মস্তিষ্কের সিস্ট

অ্যারাকনয়েড সিস্ট, কলোয়েড সিস্ট বা অন্যান্য ব্রেইন সিস্ট CSF চলাচলের পথ বাধাগ্রস্ত করতে পারে। সিস্টের অবস্থান ও আকারের ওপর হাইড্রোকেফালাসের ঝুঁকি নির্ভর করে।

মাথায় গুরুতর আঘাত

দুর্ঘটনা, উঁচু স্থান থেকে পড়ে যাওয়া, সড়ক দুর্ঘটনা অথবা মাথায় গুরুতর আঘাতের পর মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণ ও প্রদাহ হতে পারে।

কিছু শিশুর ক্ষেত্রে আঘাতের পর CSF শোষণ বাধাগ্রস্ত হয়ে পোস্ট-ট্রমাটিক হাইড্রোকেফালাস তৈরি হতে পারে।

মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণ বা স্ট্রোক

শিশুদের স্ট্রোক তুলনামূলকভাবে কম হলেও নবজাতক, শিশু ও কিশোরদের মধ্যে বিভিন্ন কারণে ব্রেইন হেমোরেজ বা স্ট্রোক হতে পারে। রক্তক্ষরণের কারণে ভেন্ট্রিকলের ভেতরে বাধা সৃষ্টি হলে হাইড্রোকেফালাস হতে পারে।

ব্রেইন সার্জারির পর

কিছু ব্রেইন টিউমার, সিস্ট, রক্তক্ষরণ বা অন্য নিউরোসার্জিক্যাল রোগের অপারেশনের পর সাময়িক অথবা স্থায়ীভাবে CSF চলাচল ও শোষণে সমস্যা হতে পারে।

এ ধরনের হাইড্রোকেফালাস দ্রুত শনাক্ত করতে অপারেশনের পর নিয়মিত পর্যবেক্ষণ ও ফলোআপ প্রয়োজন।

মস্তিষ্কের প্রদাহজনিত রোগ

কিছু প্রদাহজনিত রোগ মস্তিষ্কের আবরণ ও CSF শোষণ ব্যবস্থাকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে। এর ফলে কমিউনিকেটিং হাইড্রোকেফালাস তৈরি হতে পারে।

যক্ষ্মা বা টিবি মেনিনজাইটিস

বাংলাদেশে টিবি একটি গুরুত্বপূর্ণ স্বাস্থ্যসমস্যা। টিবি মেনিনজাইটিস মস্তিষ্কের আবরণে তীব্র প্রদাহ ও দাগ সৃষ্টি করে CSF চলাচল এবং শোষণ বাধাগ্রস্ত করতে পারে।

টিবি মেনিনজাইটিসজনিত হাইড্রোকেফালাস দ্রুত চিকিৎসা না করলে দৃষ্টিশক্তি, চলাফেরা, বুদ্ধিবিকাশ ও জীবনহানির গুরুতর ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।

হাইড্রোকেফালাস কি বাবা-মায়ের কোনো ভুলের কারণে হয়?

বেশিরভাগ ক্ষেত্রে হাইড্রোকেফালাস বাবা-মায়ের কোনো সরাসরি ভুলের কারণে হয় না। জন্মগত গঠনগত সমস্যা, জেনেটিক কারণ, সংক্রমণ, রক্তক্ষরণ বা টিউমারের মতো চিকিৎসাবিষয়ক কারণ এর জন্য দায়ী হতে পারে।

অভিভাবকদের দোষারোপ না করে শিশুর রোগ দ্রুত শনাক্ত করা এবং উপযুক্ত চিকিৎসা নেওয়াই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।

গর্ভাবস্থায় হাইড্রোকেফালাস শনাক্ত করা যায় কি?

অনেক ক্ষেত্রে গর্ভাবস্থার আল্ট্রাসনোগ্রাম বা ফিটাল অ্যানোমালি স্ক্যানে শিশুর মস্তিষ্কের ভেন্ট্রিকল বড় দেখা যেতে পারে। এই অবস্থাকে ভেন্ট্রিকুলোমেগালি বলা হয়।

ভেন্ট্রিকল বড় হলেই সব ক্ষেত্রে গুরুতর হাইড্রোকেফালাস হবে—এমন নয়। তবে বিষয়টি অবহেলা করা উচিত নয়। প্রয়োজন অনুযায়ী ফিটাল মেডিসিন বিশেষজ্ঞ, প্রসূতি বিশেষজ্ঞ, নবজাতক বিশেষজ্ঞ এবং পেডিয়াট্রিক নিউরোসার্জনের সমন্বিত পরামর্শ প্রয়োজন হতে পারে।

নবজাতক ও ছোট শিশুর হাইড্রোকেফালাসের লক্ষণ

ছোট শিশুর মাথার হাড় সম্পূর্ণভাবে জোড়া না লাগায় মস্তিষ্কের ভেতরে চাপ বাড়লে মাথা বড় হতে পারে।

গুরুত্বপূর্ণ লক্ষণগুলো হলো—

  • মাথার পরিধি দ্রুত বৃদ্ধি পাওয়া
  • বয়সের তুলনায় মাথা অস্বাভাবিক বড় হওয়া
  • মাথার নরম অংশ ফুলে থাকা
  • মাথার ত্বকের শিরা স্পষ্ট হওয়া
  • চোখ নিচের দিকে নেমে যাওয়া
  • বারবার বমি
  • খাওয়ায় অনীহা
  • অতিরিক্ত কান্না বা বিরক্তি
  • অতিরিক্ত ঘুম বা নিস্তেজতা
  • খিঁচুনি
  • মাথা ধরে রাখতে দেরি
  • বসতে, দাঁড়াতে বা হাঁটতে দেরি
  • শিশুর স্বাভাবিক বিকাশ থেমে যাওয়া

বড় শিশুদের হাইড্রোকেফালাসের লক্ষণ

বড় শিশু ও কিশোরদের মাথার হাড় শক্ত হয়ে যাওয়ায় মাথা সাধারণত বড় হয় না। তাদের মধ্যে দেখা দিতে পারে—

  • বারবার মাথাব্যথা
  • সকালে বেশি মাথাব্যথা
  • বমি বা বমি বমি ভাব
  • চোখে ঝাপসা বা ডাবল দেখা
  • হাঁটায় ভারসাম্যহীনতা
  • খিঁচুনি
  • অতিরিক্ত ঘুম
  • আচরণে পরিবর্তন
  • পড়াশোনায় মনোযোগ কমে যাওয়া
  • দুর্বলতা
  • অচেতনতা

কখন দ্রুত চিকিৎসকের কাছে যেতে হবে?

নিচের লক্ষণগুলো দেখা দিলে দ্রুত বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ নিন—

  • শিশুর মাথা দ্রুত বড় হচ্ছে
  • ফন্টানেল ফুলে আছে
  • চোখ নিচের দিকে নেমে যাচ্ছে
  • বারবার বমি হচ্ছে
  • খিঁচুনি হচ্ছে
  • শিশুর সাড়া কমে যাচ্ছে
  • তীব্র মাথাব্যথা হচ্ছে
  • শিশুর দৃষ্টি কমে যাচ্ছে
  • হাঁটাচলায় সমস্যা হচ্ছে
  • শিশুর বিকাশ পিছিয়ে যাচ্ছে
  • শান্ট থাকা শিশুর জ্বর, বমি বা মাথাব্যথা হচ্ছে

শিশু অচেতন হয়ে গেলে, দীর্ঘসময় খিঁচুনি হলে, শ্বাসকষ্ট হলে অথবা দ্রুত শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে নিকটস্থ হাসপাতালের জরুরি বিভাগে নিয়ে যেতে হবে।

হাইড্রোকেফালাসের কারণ কীভাবে নির্ণয় করা হয়?

শুধু হাইড্রোকেফালাস শনাক্ত করাই যথেষ্ট নয়। এর মূল কারণ শনাক্ত করাও অত্যন্ত জরুরি। কারণের ওপর চিকিৎসা পদ্ধতি নির্ভর করে।

ক্লিনিক্যাল পরীক্ষা

চিকিৎসক শিশুর—

  • মাথার পরিধি
  • ফন্টানেলের অবস্থা
  • চোখের নড়াচড়া
  • হাত-পায়ের শক্তি
  • খিঁচুনির ইতিহাস
  • বিকাশের ধাপ
  • জন্মের ইতিহাস
  • সংক্রমণ বা রক্তক্ষরণের ইতিহাস

মূল্যায়ন করেন।

নিউরোসোনোগ্রাম

নবজাতক বা ছোট শিশুর ফন্টানেল খোলা থাকলে আল্ট্রাসাউন্ডের মাধ্যমে ভেন্ট্রিকল বড় হয়েছে কি না দেখা যায়।

সিটি স্ক্যান

জরুরি অবস্থায় সিটি স্ক্যান দ্রুত মস্তিষ্কের ভেন্ট্রিকল, রক্তক্ষরণ, টিউমার অথবা CSF চলাচলের বাধা সম্পর্কে ধারণা দিতে পারে।

এমআরআই

হাইড্রোকেফালাসের কারণ বিস্তারিতভাবে জানতে এমআরআই গুরুত্বপূর্ণ। এতে মস্তিষ্কের গঠন, অ্যাকুইডাক্টাল স্টেনোসিস, টিউমার, সিস্ট, কিয়ারি ম্যালফরমেশন এবং CSF চলাচলের পথ ভালোভাবে দেখা যায়।

অন্যান্য পরীক্ষা

রোগের সম্ভাব্য কারণ অনুযায়ী রক্ত পরীক্ষা, সংক্রমণের পরীক্ষা, চোখের পরীক্ষা অথবা অন্যান্য বিশেষায়িত পরীক্ষা প্রয়োজন হতে পারে।

হাইড্রোকেফালাসের চিকিৎসা

হাইড্রোকেফালাসের চিকিৎসা নির্ভর করে—

  • শিশুর বয়স
  • রোগের কারণ
  • ভেন্ট্রিকলের আকার
  • মস্তিষ্কের চাপ
  • শিশুর উপসর্গ
  • সংক্রমণ আছে কি না
  • টিউমার বা সিস্ট আছে কি না
  • শিশুর সামগ্রিক শারীরিক অবস্থা

চিকিৎসার সম্ভাব্য পদ্ধতির মধ্যে রয়েছে—

VP Shunt Surgery

ভেন্ট্রিকুলো-পেরিটোনিয়াল শান্ট বা VP Shunt-এর মাধ্যমে মস্তিষ্কের অতিরিক্ত CSF একটি সূক্ষ্ম টিউব দিয়ে পেটের ভেতরে পাঠানো হয়। সেখানে শরীর তরলটি শোষণ করে নেয়।

Endoscopic Third Ventriculostomy বা ETV

নির্বাচিত অবস্ট্রাকটিভ হাইড্রোকেফালাস রোগীর ক্ষেত্রে এন্ডোস্কোপের মাধ্যমে CSF চলাচলের বিকল্প পথ তৈরি করা হয়।

ETV with CPC

কিছু নির্বাচিত শিশুর ক্ষেত্রে ETV-এর সঙ্গে Choroid Plexus Cauterization বা CPC বিবেচনা করা হতে পারে।

VSG Shunt

অপরিণত নবজাতকের মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণের পর সাময়িকভাবে CSF সরানোর জন্য নির্বাচিত ক্ষেত্রে Ventriculo-Subgaleal Shunt বা VSG Shunt ব্যবহার করা হতে পারে।

মূল রোগের চিকিৎসা

ব্রেইন টিউমার, সিস্ট, সংক্রমণ, টিবি মেনিনজাইটিস অথবা রক্তক্ষরণের কারণে হাইড্রোকেফালাস হলে CSF-এর চাপ কমানোর পাশাপাশি মূল রোগের চিকিৎসাও প্রয়োজন।

হাইড্রোকেফালাসের জন্য কেন নেফাউর’স নিউরোকেয়ারে আসবেন?

শিশুদের হাইড্রোকেফালাসের চিকিৎসায় শুধু মাথার ভেতর জমে থাকা তরল কমানো নয়, বরং রোগের মূল কারণ নির্ণয়, শিশুর বিকাশ পর্যবেক্ষণ এবং দীর্ঘমেয়াদি ফলোআপ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

শিশু-কেন্দ্রিক নিউরোকেয়ার

নেফাউর’স নিউরোকেয়ারে জন্ম থেকে ১৮ বছর বয়সী শিশু-কিশোরদের ব্রেইন, নার্ভ, স্পাইন, স্ট্রোক এবং সংশ্লিষ্ট নিউরোলজিক্যাল ও নিউরোসার্জিক্যাল রোগের মূল্যায়ন করা হয়।

হাইড্রোকেফালাসের কারণভিত্তিক মূল্যায়ন

সব হাইড্রোকেফালাসের চিকিৎসা এক নয়। অ্যাকুইডাক্টাল স্টেনোসিস, মেনিনজাইটিস, টিবি, ব্রেইন টিউমার, মাইলোমেনিনগোসিল অথবা রক্তক্ষরণজনিত হাইড্রোকেফালাসের চিকিৎসা পরিকল্পনা ভিন্ন হতে পারে।

নেফাউর’স নিউরোকেয়ারে শিশুর বয়স, উপসর্গ, স্ক্যান এবং রোগের কারণ বিবেচনা করে চিকিৎসা পরিকল্পনা করা হয়।

প্রয়োজনীয় পরীক্ষা ও নিউরোইমেজিং সমন্বয়

প্রয়োজন অনুযায়ী নিউরোসোনোগ্রাম, সিটি স্ক্যান, এমআরআই এবং অন্যান্য পরীক্ষা নির্ধারণ ও সমন্বয়ের মাধ্যমে রোগের কারণ শনাক্ত করার চেষ্টা করা হয়।

রোগীভিত্তিক চিকিৎসা পরিকল্পনা

শিশুর জন্য VP Shunt, ETV, ETV with CPC, VSG Shunt, পর্যবেক্ষণ অথবা মূল রোগের চিকিৎসার মধ্যে কোনটি উপযুক্ত হতে পারে, তা রোগীর অবস্থা অনুযায়ী বিবেচনা করা হয়।

অপারেশনের আগে ও পরে পরামর্শ

অপারেশনের প্রয়োজন, সম্ভাব্য পদ্ধতি, ঝুঁকি, ফলোআপ, শান্টের সমস্যা এবং বিপদসংকেত সম্পর্কে অভিভাবকদের সহজ ভাষায় বোঝানো হয়।

দীর্ঘমেয়াদি ফলোআপ

হাইড্রোকেফালাস অনেক শিশুর জন্য দীর্ঘমেয়াদি পর্যবেক্ষণ প্রয়োজন এমন একটি রোগ। শিশুর মাথার বৃদ্ধি, দৃষ্টি, খিঁচুনি, হাত-পায়ের শক্তি, কথা বলা, শেখার ক্ষমতা এবং স্কুলের কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ প্রয়োজন হতে পারে।

নিউরোডেভেলপমেন্ট ও পুনর্বাসন সহায়তা

হাইড্রোকেফালাসের কারণে কোনো শিশুর বসা, দাঁড়ানো, হাঁটা, কথা বলা বা শেখায় বিলম্ব হলে প্রয়োজন অনুযায়ী ফিজিওথেরাপি, স্পিচ থেরাপি, ডেভেলপমেন্টাল থেরাপি এবং অন্যান্য সহায়ক সেবার পরিকল্পনা করা যেতে পারে।

অভিভাবকবান্ধব পরিবেশ

শিশুর মস্তিষ্কের রোগ নিয়ে পরিবারে ভয় ও উদ্বেগ থাকা স্বাভাবিক। নেফাউর’স নিউরোকেয়ারে রোগের কারণ, পরীক্ষা, চিকিৎসার ধাপ এবং ফলোআপের প্রয়োজনীয়তা সহজ ভাষায় বোঝানোর ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়।

হাইড্রোকেফালাস প্রতিরোধ করা সম্ভব কি?

সব ধরনের হাইড্রোকেফালাস প্রতিরোধ করা সম্ভব নয়। তবে কিছু ঝুঁকি কমাতে—

  • গর্ভাবস্থায় নিয়মিত চেকআপ করুন
  • চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী ফোলিক অ্যাসিড গ্রহণ করুন
  • গর্ভাবস্থায় সংক্রমণ থেকে সতর্ক থাকুন
  • সময়মতো অ্যানোমালি স্ক্যান করান
  • শিশুর টিকা সময়মতো দিন
  • মেনিনজাইটিস বা জ্বরের সঙ্গে খিঁচুনি হলে দ্রুত চিকিৎসা নিন
  • নবজাতকের মাথার পরিধি নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করুন
  • শিশুকে মাথায় আঘাত থেকে সুরক্ষিত রাখুন
  • মাথা দ্রুত বড় হলে দেরি না করে বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিন

অভিভাবকদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ বার্তা

হাইড্রোকেফালাস মানেই শিশুর ভবিষ্যৎ শেষ হয়ে যাওয়া নয়। সময়মতো রোগ শনাক্তকরণ, কারণ নির্ণয়, উপযুক্ত চিকিৎসা এবং নিয়মিত ফলোআপের মাধ্যমে অনেক শিশু উন্নত জীবনযাপন করতে পারে।

তবে চিকিৎসায় অযথা দেরি হলে মস্তিষ্কের ওপর দীর্ঘস্থায়ী চাপ সৃষ্টি হয়ে দৃষ্টিশক্তি, চলাফেরা, কথা বলা, শেখার ক্ষমতা ও বুদ্ধিবিকাশ ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।

শিশুর মাথা অস্বাভাবিকভাবে বড় হচ্ছে, চোখ নিচের দিকে নেমে যাচ্ছে, বারবার বমি হচ্ছে, খিঁচুনি হচ্ছে অথবা স্বাভাবিক বিকাশে বিলম্ব দেখা যাচ্ছে—এমন হলে দ্রুত পেডিয়াট্রিক নিউরোসার্জিক্যাল পরামর্শ নিন।

নেফাউর’স নিউরোকেয়ারে যোগাযোগ

ঠিকানা:
হাউস নং ২৪/১, লেভেল নং ৭, শ্যামলী স্কয়ার, শ্যামলী সিনেমা হল বিল্ডিং, মিরপুর রোড, শ্যামলী, ঢাকা–১২০৭, বাংলাদেশ।

সিরিয়াল ও অ্যাপয়েন্টমেন্ট:
০১৯১২-৯৮৮১৮২
০১৬০৭-০৩৩৫৩৫

ওয়েবসাইট:
https://www.bdpaediatricneurocare.com

Facebook:
https://www.facebook.com/NafaursNeurocare

Instagram:
https://www.instagram.com/neurocarebd

TikTok:
https://www.tiktok.com/@nafaurs.neurocare

YouTube:
https://www.youtube.com/@nafaursneurocare

Click to Chat

Click to Chat
Scroll to Top